
ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক, দক্ষিণ দিনাজপুরঃ শীতের হাওয়ার নাচন লাগতে না লাগতেই মন আনচান করে পিঠে-পুলির জন্য। এজন্য অবশ্য অপেক্ষা করতে হয় পৌষ সংক্রান্তি অবধি। বাঙালির ক্যালেন্ডারে এই দিনটিই নির্ধারিত হয়ে আছে পৌষপার্বন হিসাবে। মা ঠাকুমাদের হাতে তৈরী নানা রকমের পিঠে-পুলি -পায়েস -পাটিসাপ্টার আঘ্রাণে এদিন ম-ম করে সারা বাড়ি। আর এর উপযুক্ত সঙ্গতের জন্য থাকে নলেন গুড়। তবে তার আগে যেটা দরকার সেটা হল মাটির সরা, যাতে তৈরী হবে বাঙালির সুস্বাদু পিঠে। সেই সরা তৈরিতে এখন ব্যস্ত দক্ষিণ দিনাজপুরের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। নাওয়া খাওয়া ভুলে, প্রবল ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে এঁটেল মাটিতে জল মিশিয়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে সেই মাটিকে মাখিয়ে সরা তৈরির উপযোগী করে তুলছেন তারা। শিল্পীরা জানালেন,এ খুব পরিশ্রমের কাজ। নরম মাটিকে ছাঁচে ফেলে তৈরী করা হয় বিভিন্ন আকৃতির সরা। কোনওটার নাম এক খুঁটির সরা আবার কোনটা সাত খুঁটির সরা। শুধু সরাই নয়, তার সাথে তৈরী করতে হয় উপযুক্ত ঢাকনাও, যাকে ঢাকন বলে। এরপর কাঁচা সরাগুলিকে আগুনে পুড়িয়ে পাকা করে বিক্রি করা হয় খুচরো অথবা পাইকারি হিসাবে।
মৃৎ শিল্পী লক্ষ্মী পাল, কল্পনা পালরা জানালেন, এই শীতে এত পরিশ্রম করে সরা, ঢাকন তৈরি করলেও এখন আর আগের মত এগুলির চাহিদা নেই। এখন তো হাটে-বাজারেও পিঠে-পুলি বিক্রি হয়। ফলে বাড়িতে পিঠে-পুলি বানানোর হ্যাপা এখন আর অনেকেই নিজের ঘাড়ে নিতে চান না। তাই সরার বিক্রিও অনেক কমে গেছে। এদিকে মাটি সহ জ্বালানী খরচও আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। সেই অনুপাতে সরা, ঢাকনের দাম পাওয়া যায় না। শিল্পী দীনেশ পাল, দেবেন্দ্র পালরা জানালেন, আমরা বাপ ঠাকুরদার ব্যবসা যদিওবা কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছি। কিন্তু ভাল উপার্জন না থাকায় নতুন প্রজন্ম এই পেশা থেকে সরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
তবে সরা কেনা থেকে বিরত থাকলেও পৌষ সংক্রান্তির দিন পিঠে পুলি থেকে বাঙালি হয়তো কোনোদিনই মুখ ফেরাবে না। কারণ প্রতিটি বাঙালী বাড়ির অন্দরমহলের উৎসব এই পিঠে পুলি উৎসব। এখনও পৌষ পার্বণের দিনে গ্রামবাংলায় বাড়ির মহিলারা সকাল থেকেই গোটা বাড়ি গোবর দিয়ে লেপে সুন্দর আলপনা আঁকেন। কারণ পৌষ পার্বনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির লক্ষ্মী পুজোও। এরপর দুপুর হতে না হতেই চালের গুঁড়ো, নারকেল কোঁড়া, ক্ষীর, খেজুর গুড় প্রভৃতি দিয়ে বাড়ির বয়স্ক মহিলারা পিঠেপুলি তৈরির কাজ শুরু করে দেন। তারপর রাতে পৌষ-বন্দনা আর পরের দিন সকালে রোদে পিঠ দিয়ে চলে নলেন গুড়ে ডুবিয়ে পিঠেতে কামড়। আসলে এই স্বাদেই তো জড়িয়ে আছে ষোলো আনা বাঙালিয়ানা।

