
পিয়ালী দাস,বীরভূমঃ আজ তার বড়ই আনন্দের দিন, উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম দশজনের মধ্যে সেও একজন। কিন্তু এই আনন্দের দিনে সবার আগে যাকে মনে পড়ছে, তিনি হলেন অনিশার বাবা। আজ থেকে সাত বছর আগে বাবাকে হারিয়ে ছিল অনিশা। তারপর পড়াশুনায় এসেছিল অনিশ্চয়তা। সেই অনিশ্চয়তাকে কাটিয়ে দাদু, কাকাদের সহযোগিতায় আজ অনিশা উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে অষ্টম স্থানাধিকারী,বীরভূম জেলায় দ্বিতীয় এবং জেলায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম।
পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াকালীন বাবাকে হারায় অনিশা। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বড় অসহায় হয়ে পড়ে তার মা। পড়াশুনা বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। কিন্তু তা হতে দেননি অনিশার কাকা, ঠাকুরদা, ঠাকুমা সকলে মিলে। আর আজ সেই কষ্টের ফল মিলল। উচ্চমাধ্যমিকে ৪৮৩ নাম্বার পেয়ে গোটা রাজ্যে অষ্টম, জেলায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং জেলায় সবার মধ্যে দ্বিতীয়। অনিশা ময়ূরেশ্বরের কোটাসুর হাইস্কুলের ছাত্রী। তার এমন ফলাফলে স্কুল, পরিবার, প্রতিবেশী সবাই খুব খুশি।
এত ভালো ফলাফলের পর অনিশা বলে, “ফলাফলে খুবই ভালো লাগছে। দিনে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা পড়াশুনা করতাম। আশা করেছিলাম এমনটাই হবে। টিউশনে তিন ঘন্টা মত পড়তে হত। পড়ার থেকে লিখতাম বেশি। মাত্র দুজন টিউশন নিয়েই আমি পড়াশুনা করেছি। পড়াশুনাতে বাড়ির লোকেরা সবাই খুব সাহায্য করত। মা সব সময় পাশে বসে থাকতো। কোচিংয়ের শিক্ষকরা তো যে ভাবে সাহায্য করেছেন, তাতে তাঁদের অবদান ভোলার নয়। তবে সব থেকে বেশি সাহায্য করেছে দাদু আর কাকু। কাকু উৎসাহ দিতেন আর দাদু তো আমার মেরুদন্ড। তবে এগিয়ে যাওয়ার পিছনে একজন নয় সকলেই শিক্ষক শিক্ষিকা থেকে আরম্ভ করে বাড়ির সকলেরই অবদান অনস্বীকার্য।”
মেয়ের এত ভালো ফলাফলের পর চোখের কোনে জল নিয়ে মা মিতালি মণ্ডলের প্রতিক্রিয়া, “দারুন লাগছে, এর থেকে খুশি আর কিছু হতে পারে না। আমি শুধু বাড়ির রান্নার কাজ করি, অন্যান্য সকলের সহযোগিতায় আজ মেয়ের এত ভালো রেজাল্ট। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর আমি তো ওকে পড়াশুনা করাতে পারতাম না, কারন রোজগারের কিছু ছিল না। তারপর দাদু, ঠাকুমা, কাকার সাহায্যে ও পড়াশুনা করেছে।”
অনিশার ছোটো কাকা অমরেন্দ্র নাথ মণ্ডল বলেন, “ অনিশার সাফল্যে আজ খুব খুশি আমরা, পরিবারের আমাদের সকলের আনন্দ। তবে ওর কষ্টই ওর সাফল্যের চাবি কাঠি। প্রচন্ড কষ্ট করেছে। বাবা অর্থাৎ আমার দাদা মারা যায় অনিশা যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। তারপর ওর পড়াশুনার প্রতি ইচ্ছায় এবং আমরা সংগ্রাম করে পাশে থেকে উৎসাহ দিয়েছি, পড়াচ্ছি তাতে আজ এই সাফল্যে খুবই আনন্দিত। মাধ্যমিকে আশানুরূপ ফল হয়নি, পেয়েছিল ৯০.৪%, তারপর একটা লক্ষ্য নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক, আর আজ রাজ্যে অষ্টম। গ্রাম্য রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া, জীবনে বাবাকে হারানো, প্রতি ক্ষেত্রেই অনিশার লড়াইয়ের আজ এই ফল।”
সকলের আনন্দের মাঝে কথা বলার সময় প্রত্যেকেই আজকের এই দিনটিতে যাকে বেশি খুঁজছেন তিনি হলেন অনিশার বাবা। অনিশা শেষমেষ বলেই ফেলল “আজ যদি বাবা থাকত……”
