Headlines
Loading...
সেদিনের কুলকুল কুলাবতী আজ অবলুপ্তির পথে, হতাশা প্রবীনদের মধ্যে।

সেদিনের কুলকুল কুলাবতী আজ অবলুপ্তির পথে, হতাশা প্রবীনদের মধ্যে।


ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,বাঁকুড়া : কুলাবতী নিখোঁজ। বিগত এক দশকে খুঁজেও তার দেখা মেলেনি। তাই প্রবীন মানুষদের মনে শান্তি নেই। কি জানি কি হয় পরিবারে! এরকম একটা আশঙ্কা আজকাল তাঁদের পেয়ে বসেছে। এই কুলাবতীকে প্রবীনরা খুব ভালবাসেন। কুলাবতী আসলে বাঁকুড়া সহ রাঢ় বাংলার এক লোকাচার। সারা কার্তিক মাস জুড়ে বাঁকুড়া জেলায় এই লোকাচার পালিত হয়। জেলার বেশ কয়েক হাজার বাসিন্দা এই উৎসবে মেতে ওঠেন। কিছুদিন আগেও জেলায় উৎসব আকারে এই লোক প্রথা পালিত হতো। স্থানীয়দের কাছে এই লোকাচার কুলকুল কুলাবতী নামেই বেশী পরিচিত।

আসলে কি এই লোকাচার?
অবিবাহিত ছেলেমেয়েরাই এই লোকাচার পালন করেন। বাঁশের তৈরী ডোঙ্গার মত এক বিশেষ ধরনের কুলোতে মাটির প্রদীপ জ্বেলে বাড়ি সংলগ্ন জলাশয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় প্রতি সন্ধ্যায়। একটু বড় ধরনের মাটির প্রদীপে তেল ভর্তি করে সলতে দিয়ে জ্বালানো হয়। এতে জ্বলাশয়ে ভাসতে ভাসতে দীর্ঘ সময় সেটি জ্বলতে থাকে। একটি জলাশয়ে বেশ কয়েকটি পরিবার প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসানোয় রাতের অন্ধকারে সেগুলি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকে এই প্রথা মানা হয়। সন্ধ্যার পর ছোট ছোট দলে অবিবাহিতরা বাঁশের তৈরী ডোঙায় জ্বলন্ত প্র্দীপ জ্বালিয়ে ব্রতকথা বলতে বলতে জ্বলাশয়ে যান ভাসাতে।সেই সময় সমাজের সকলের মঙ্গল কামনায় ৯ বার ব্রত কথা গাওয়ার  রীতি প্রচলিত। কার্তিক মাসের শেষ দিন ব্রত কথা লোকাচারটি শেষ হয়। এদিন ডোঙা ভাসিয়ে প্রসাদ বিতরন করা হয় সকলের মধ্যে । এটি কার্যত দেওয়ালির পর আর এক শব্দহীন আলোর উৎসব। এই ডোঙা ভাসানোর সময় ৯টি ফুল ও ৯টি তুলসি পাতা দেওয়া হয়।

কি বলছেন প্রবীণরা?
কানকাটা এলাকার বাসিন্দা সবিতা মাল জানান, এই উৎসব  গ্রামে বেশী দেখা গেলেও একসময়  শহরেও পালিত হতো। তিনি জানান,প্রায় ১৫-১৬ বছর প্রদীপ ভাসিয়ে তিনি নিজে এই প্রথা পালন করে ছিলেন। বর্তমানে তা বন্ধ  করে দিয়েছেন। কানকাটা এলাকায় অনেক বাড়ি থেকেই এই প্রদীপ দেওয়া হোত। এখন আর তা চোখেই পড়ে না। 
একই কথা জানান ময়রা বাঁধ এলাকার প্রভাতী গরাই ও রবিলোচন বাড়ুই। তাদের বক্তব্য, সমাজের কল্যান ও সুস্বাস্থ্যের কামনায় মাকালী সহ সব দেবদেবী ও অরণ্য দেবতাকে উদ্দেশ্য করে এই প্রদীপ ভাসানো হয়। তবে বর্তমানে সেই প্রথা হারিয়ে গেছে। 
শালবনী ও নাম আঁচুড়ি এলাকার বলরাম আঠা ও নব পালও একই কথা বলেলন। কুলাবতী হারিয়ে যাওয়ায় তারা সকলে হতাশ। তাদের মতে সকলের কল্যান কামনায় পুর্বপুরুষেরা এই প্রথা চালু করেছিলেন।                                           

অন্যদিকে জেলার পরিবেশবাদী সংস্থা মাই ডিয়ার ট্রিজ এন্ড ওয়াইল্ডস এর সম্পাদক ঝর্না গাঙ্গুলী জানান, এই প্রথা সম্ভবত চালু হয়েছিল পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।শরতের শেষে ও শীতের শুরুতে আবহাওয়ার একটা পরিবর্তন আসে।শীত ও কুয়াশা পড়তে শুরু করে।মাঠের পাকা ধান কেটে খামার বা বাড়িতে তোলার কাজ চলে। আশ্রয় হারায় পোকামাকড়েরা। তাই সন্ধ্যার পর অন্ধকারে আলো দেখলে সেগুলি ছুটে আসে। সেগুলি বাড়িতে ঢুকে পড়ে অস্বস্তিকর ও  অস্বাস্থ্যকর একটা পরিবেশের সৃষ্টি করে। জলাশয়ে মধ্যে জলন্ত প্রদীপের আলো দেখে পোকামাকড়েরা দলে দলে সেখানে ছুটে যায় এবং আলোর শিখায় ধাক্কা খেয়ে জলের মধ্যে পড়ে মারা যায়।

জেলার লোকসংস্কৃতি গবেষক তন্ময় ব্যানার্জ্জী বললেন, এই প্রথা সম্ভবত চালু করা হয়েছিল দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে বিদায়বেলায় আলো দেখানোর লক্ষ্যে।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});