
ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,পূর্ব বর্ধমান: বর্ধমান শহরের জহুরী পট্টি এলাকার একটি সোনার দোকান থেকে গহনা চুরির ঘটনায় এবার নাম জড়াল কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর এই ঘটনায় আলোড়ন ছড়িয়েছে রাজ্য জুড়ে। শুক্রবার বর্ধমানের সোনাপট্টিতে পূর্ব বর্ধমান স্বর্ণকার সমিতির ডাকা সাংবাদিক বৈঠকে সংগঠনের সহ সভাপতি জগন্নাথ দে জানিয়েছেন, গত দুর্গাপুজোর ঠিক আগে ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর নাগাদ বর্ধমান শহরের সোনাপট্টিতে শান্তি জুয়েলার্স নামে একটি দোকানে ঢোকে দুই যুবক।

সেই সময় দোকানের মালিক রাজেন্দ্রনাথ দে বাড়ি গেছিলেন খেতে। ওই দুই যুবক সোনার দুটি বালা কিনতে চান। দোকানে থাকা এক কর্মচারী তাঁদের সোনার বালা এবং দুল দেখাতে শুরু করেন। সেই সময় কর্মচারীর সামান্য অসাবধানতার সুযোগে দুটি সোনার বালা হাত সাফাই করেন ওই দুই যুবক। এরপর তাঁরা দোকানের কর্মচারীকে জানান, প্রয়োজনীয় টাকা তাদের কাছে নেই। এটিএম থেকে আনতে যাচ্ছেন। এরপর তারা দোকান ছেড়ে বেড়িয়ে চলে যান। আর তারপরেই দোকানের কর্মচারী দেখেন দুটি সোনার বালা নেই। কিন্তু ততক্ষণে দুই যুবক কর্পূরের মত উধাও হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে গোটা বিষয়টি তাঁরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখেন এবং বর্ধমান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। বর্ধমান থানার পুলিশ এই ঘটনার তদন্তে নামে। আর এরপরেই একের পর এক তথ্য উঠে আসতে শুরু করে।
তদন্তে নেমে বর্ধমান থানার তদন্তকারী পুলিশ অফিসার নিউ ব্যারাকপুর এবং হাওড়ার বালির পঞ্চাননতলা থেকে দুই যুবককে গ্রেপ্তারর করে। ধৃতদের নাম সুনীল ভর এবং নির্মাল্য ভাদুড়ি। উভয়েরই বয়স ৩০-এর কোটায়। তারা দুজনেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। সুনীল ভর ওরফে বাবুর বাড়ি নিউ ব্যারাকপুরে। নির্মাল্য ভাদুড়ি ওরফে রানার বাড়ি হাওড়ার বালির পঞ্চাননতলা এলাকায়।
পুলিশ জানিয়েছে সুনীল যাদবপুর থেকে মাষ্টার ডিগ্রী সম্পূর্ণ করেছে। বর্তমানে আর পড়াশোনার মধ্যে নেই। অন্যদিকে, নির্মাল্য ভাদুরী ওরফে রানা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার ডিগ্রী করার পাশাপাশি এম ফিল করারও চেষ্টা করছে। সেজন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়েও সে চেষ্টা করছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে, পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই ছাত্র এর আগেও কলকাতার একাধিক থানা এলাকায় একই কায়দায় সোনার গহনা নিয়ে পালিয়েছে। তাদের নামে কেবলমাত্র কলকাতার বিভিন্ন থানা এলাকায় ৭টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। গত আগষ্ট মাসে কলকাতার সিঁথি থানায় একটা কেস হয়েছে। এছাড়াও কালীঘাটে, গরিয়াহাটে, মুচিপাড়া এবং শিয়ালদহেও অভিযোগ রয়েছে।
বর্ধমান থানার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই দুই যুবক বেছে বেছে সেই সমস্ত দোকানেই ঢুকত যেখানে গহনার সম্ভার বেশি এবং ভিড় থাকে। এরপর একজন দরদস্তুর করতে থাকার মাঝেই অন্যজন হাত সাফাই করতে থাকেন। আর তারপরই তাদের কাছে প্রয়োজনীয় টাকা নেই এবং এটিএম থেকে আনার নাম করে বেপাত্তা হয়ে যেত। এখনও পর্যন্ত পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পেরেছে তাদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ হয়েছে সেই সমস্ত ঘটনার ক্ষেত্রেই এইভাবেই তারা অপারেশন চালিয়েছে।
এদিকে, বর্ধমানের সোনাপট্টিতে শান্তি জুয়েলার্স থেকে দুটি সোনার বালা চুরি করার পর পুলিশ ধৃতদের কাছ থেকে তা উদ্ধারও করে। গত ১০ জানুয়ারী বর্ধমান আদালত থেকে ওই দুটি সোনার বালা শান্তি জুয়েলার্সের মালিক রাজেন্দ্রনাথ দের হাতে তুলেও দেওয়া হয়। এদিন জগন্নাথ দে জানিয়েছেন, ওই ঘটনার পরই তাঁরা ওই দুই যুবকের ছবি দিয়ে গোটা জেলা সহ তাঁদের পরিচিত এলাকাতেও সতর্ক করে দেন। তিনি এদিন দাবী করেছেন, যেভাবে বর্ধমান শহরে সাম্প্রতিককালে একের পর এক দোকানে চুরি, ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে সেই সমস্ত ঘটনার কিনারা অধিকাংশ না হলেও এই দুটি বালা চুরির ঘটনায় বর্ধমান জেলা পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতা দেখিয়েছেন।
উল্লেখ্য, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একের পর এক ঘটনায় উত্তাল হয়েছে বছরভর। কখনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে বাধা দেওয়া নিয়ে উত্তাল হয় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। আবার কখনও এনআরসি আইনের প্রতিলিপি ছিঁড়ে কৃতি ছাত্রীর প্রতিবাদ থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের লাঠিচার্জ। সাম্প্রতিক সময়ে বারবার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এবার খবরের শিরোনামে উঠে এল খোদ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই কৃতি ছাত্র একের পর এক সোনার গহনা চুরির ঘটনায় যুক্ত।
যদিও পুলিশ জানিয়েছেন, বর্তমানে এই দুই যুবক বর্ধমানের কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে রয়েছে। ইতিমধ্যেই বাকি কেসগুলির হদিশ পেতে বিভিন্ন থানা তাদের পুলিশী হেফাজতে নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। কিন্তু যাদবপুরের এই দুই কৃতি প্রাক্তনীদের এহেন এই ঘটনায় যুক্ত থাকার খবর সামনে আসতেই রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
