india
latest
state
vivekananda
এডুটন
জেলা
দেশ
বিবেকানন্দ
রাজ্য
সংস্কৃতি
স্বামীজীর জন্মের ১৫৬ বছর পরেও বিবেক দর্শন হলনা ভারতবাসীর !
মালা ঘোষ: ভারতকে আত্মশক্তিতে ভরপুর দেখতে চেয়ে ছিলেন যে মানুষটি - তিনি স্বামী বিবেকানন্দ। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক সন্ন্যাসী, যিনি নিজে বৈরাগ্যের জীবনযাপন করেও একটানা পরিশ্রম করে গেছেন শুধু দেশের মানুষের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার অন্ধকার দূর করতে। তিনি বুঝেছিলেন সুদীর্ঘকাল অবদমিত থেকে ভারত তার নিজের চরিত্র হারাতে বসেছে। তাই দেশকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার নিজস্ব ঐতিহ্য আর নৈতিক শক্তি।
১৮৮৬ তে গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ সন্ন্যাসীর জীবন গ্রহণ করেন নরেন্দ্রনাথ। স্বামী বিবেকানন্দ রূপে তিনি বের হন ভারত ভ্রমণে। আসলে ভারতকে আবিষ্কার করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। সে সময় দেশের দারিদ্র্য ও অশিক্ষায় তিনি বিচলিত হন। তিনি বুঝেছিলেন ভারতবাসী আপন শক্তিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে ভুলে গেছে। তাদের বিশ্বাস জাগাতে হবে, জাগাতে হবে নৈতিক শক্তি। একাজে তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন বেদান্তকে ,যেখানে আছে প্রাচীন ভারতীয় ধৰ্ম ও দর্শন। এই বার্তার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারই ছিল তাঁর লক্ষ্য। পাশাপাশি পাশ্চাত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেও তিনি আগ্রহী ছিলেন। যাতে ভারতীয় আধ্যাত্মিক ভাবনা সে দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারী মকর সংক্রান্তিতে জন্ম স্বামী বিবেকানন্দের। তখন তাঁর নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। কোলকাতা হাইকোর্টের উকিল বিশ্বনাথ দত্ত ও ভুবনেশ্বরী দেবীর সন্তান তিনি। অত্যন্ত মেধাবী নরেন্দ্রনাথের ছেলেবেলা থেকে একদিকে ছিল আধ্যাত্মিক ভাব অন্যদিকে তিনি ছিলেন গানের অনুরাগী আর শরীরচর্চায় পারদর্শী। একইসঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এই বিদ্যানুরাগীর মর্মে ছিল পাশ্চাত্য দর্শন ও ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ। একটা সময় ব্রাহ্মসমাজের সংস্কার আন্দোলনেও তিনি জড়িয়ে পড়েন। আসলে তিনি যে সময়টায় বড় হয়েছিলেন সে সময় দেশে আধ্যাত্মিক সংকট চলছিল। ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুঁজতে তিনি সোজা চলে যান দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাঁকে বলেন, তিনি ঈশ্বরকে তেমনিভাবেই দেখেছেন, যেমনভাবে তিনি চোখের সামনে নরেনকে দেখছেন। নরেনের আর বুঝতে বাকি রইলনা কোথায় ঈশ্বরের অবস্থান। তাঁর বাণী আজও আমাদের শেখায় - "জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।"
কিন্তু বাস্তবিকই কি তাই শিখেছি আমরা ,অর্থাৎ বিবেকানন্দের উত্তরসুরীরা ? তাঁর ভাবধারায় কি গড়ে উঠেছে দেশ ? তাঁর জন্মের ১৫৬ বছর পরেও কি ভারতবর্ষ খুঁজে যাচ্ছেনা বাঁচার পথ ?
তার কারণ, আমরা দেশ ও সমাজকে নিয়ে তেমনভাবে ভাবিনি যেমনভাবে স্বামিজী আমাদের ভাবতে শিখিয়েছিলেন।
বিবেকানন্দ বিদেশে তাঁর লক্ষ্যপূরণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তারঁ নিজের দেশ ভারত তাঁর দেখানো পথ থেকে দ্রুত সরে গেল। আজকের দেশীয় সমাজ তাঁর মূর্তিতে মালা দেয়, কিন্তু তাঁর ভাবমূর্তিকে অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেনা। তাই বিবেকানন্দের জন্মদিন পালন বোধহয় এদেশে প্রত্যেক স্তরের মানুষের কাছে এক পালনীয় গতানুগতিক উৎসবের মত। দেশের পরিচালকদের কাছে ১২ জানুয়ারি কেবল ক্যালেন্ডারে থাকা এক মনীষীর জন্মতিথি, যেদিনটাকে পালনের মাধ্যমে প্রজাদের সামনে বিবেকানন্দের পরিবর্তে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা যায়। এদেশে যুবদিবসের নামে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কেবলই কিছু অর্থহীন অর্থব্যয় হয়। যুবসমাজ কি সেখান থেকে আদৌ কিছু গ্রহণ করে? মনে হয় আসলে তাদের কিছু দেওয়াই হয়না। দেশীয় সংস্কৃতি ভুলে তারা আজ পৌঁছেছে অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে , যেখানে ছাত্র -শিক্ষক সম্পর্ক আজ বিতর্কিত, স্ত্রী -স্বামীর কাছে সুরক্ষিত নয়, মা- বাবা সন্তানের কাছে সম্মানীয় নয়। দেশের কোণায় কোণায় মাতৃহন্তার সন্ধান আজ আর বিস্ময়ের উদ্রেক করেনা।
স্বামী বিবেকানন্দের বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য শুধু আধ্যাত্মিক চেতনার বিস্তার ছিল না। এখানকার সন্ন্যাসীরা দেশের ভাল-মন্দের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারা রোগীর সেবা , প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়া, শিক্ষাবিস্তার প্রভৃতি সব কাজ করতেন। বিবেকানন্দ অনুভব করেছিলেন এদেশে স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা-যে কাজে তাঁকে সর্বাধিক সাহায্য করেছিলেন বিদেশ থেকে আসা মার্গারেট , যিনি আমাদের কাছে সিস্টার নিবেদিতা নাম পরিচিত। আজ স্ত্রী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। কিন্তু বদলে গেছে স্ত্রীদের প্রতি মূল্যবোধ। এদেশের নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান বলে দেয় এখানেই ব্যর্থ হয়েছে বিবেকানন্দের বার্তা। মূল্যবোধের এই অবক্ষয়ের সময়ে দেশকে তথা বিশ্বকে পথ দেখানোর জন্য আজ আর আমাদের কাছে কোনো বিবেকানন্দ নেই। যিনি আছেন তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে আজও ভারতবর্ষ অগ্রসর হল না।
বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যের বুকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন ভারতীয় জ্ঞান-দর্শন ও শ্রী রামকৃষ্ণের আদর্শ। কিন্তু ভারতবাসীর নিজেদের গন্ডীটুকুর মধ্যেই হলনা বিবেক-দর্শন।


